Page Nav

HIDE

Breaking News:

latest

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ও সরকারের অবস্থান: পরিবার ও সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র

  সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ও সরকারের অবস্থান: পরিবার ও সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র সৌদি আরবে মক্কায় দুই বাংলাদেশি ন...

 

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ও সরকারের অবস্থান: পরিবার ও সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র



সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ও সরকারের অবস্থান:


পরিবার ও সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র




সৌদি আরবে মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের গণমাধ্যমে এক বাংলাদেশি নারী ও এক পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখনো পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় প্রকাশ করেনি সৌদি বা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।



বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের এ বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করে জানান যে, সৌদি আরবে যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, তাদেরকে মূলত ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। আদালত কর্তৃক ঘোষিত রায়ের আনুষ্ঠানিক কপির জন্য বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে অপেক্ষা করছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের নথি হাতে পাওয়ার পর ঘটনাটির আইনি ভিত্তি এবং বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া সম্ভব হবে।



এদিকে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পুরুষ নাগরিকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় বলে জানা গেছে। তবে সরকারিভাবে এখনও তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। উক্ত ব্যক্তির মা সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগেও তার ছেলে সৌদি আরবের কারাগার থেকে পরিবারের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু সে সময় নিজের দণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়াবহ কোনো সম্ভাবনা সম্পর্কে পরিবারকে তিনি কিছুই জানাননি। আকস্মিকভাবে এই সংবাদের ফলে পরিবারটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং খবরটি শোনার পরপরই নিহতের এক নিকটাত্মীয় স্ট্রোকে মারা যান। শোকাকুল পরিবারটি বর্তমানে তাদের সন্তানের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।



স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তাদের মধ্যে একজন ওই এলাকার অধিবাসী কি না—সে সংক্রান্ত কোনো বার্তা বা চিঠি এখনো পর্যন্ত সরকারি উপায়ে জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি। প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পরই বিষয়টি সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানাতে পারবেন।



এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয় এবং এ নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মক্কায় অনুষ্ঠিত এই দণ্ডাদেশ ও কার্যকরের পেছনের প্রকৃত কারণ জানা এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য সরকার সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে।



মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশিকে সৌদি আরবের আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযুক্ত ওই দুই বাংলাদেশির পরিচয় সম্পর্কে এখন পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হয়নি।



মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশি পুরুষের পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিবিসি বাংলা। ওই ব্যক্তির মা নিশ্চিত করেছেন, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া ব্যক্তি তারই ছেলে। সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস ধরে ছেলের মুখ দেখতে পারেননি। জীবনের শেষবারের মতো যেন ছেলের মুখটি দেখতে পারেন, সেই আবেদনই জানিয়েছেন তিনি।



পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর জীবিকার সন্ধানে দালালের মাধ্যমে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান ওই যুবক। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সৌদি আরবের রিয়াদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। জানা গেছে, যে মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেখানেই তিনি পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করতেন।



ছেলের আটকের ঘটনা স্মরণ করে তার মা জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। আটকের এক মাস পর ছেলের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ হয়। তখন ছেলে তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, কর্তৃপক্ষ হয়তো কিছুদিন কারাগারে রাখার পর তাকে ছেড়ে দেবে। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববারও ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন পর, বুধবার তিনি ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবর জানতে পারেন। কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে জানতে চাইলে মা জানান, ছেলে তাকে বিস্তারিত কিছু বলেননি।



তবে পরিবারের অন্য এক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার শেষ পর্যায়ে ওই যুবক পরিবারের কাছে জানিয়েছিলেন, অভিযুক্ত নারীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে, মায়ের বর্ণনায়, একদিন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়ার পর পুলিশের একটি গাড়ি এসে তার ছেলেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা, যার পরিণতিতে এখন সন্তানের মরদেহ শেষবারের মতো দেখার আকুতি জানাচ্ছেন তিনি।



পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে যাওয়ার পর ওই বাংলাদেশি যুবক প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ফোনের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য হলেও কথা বলতেন। এসব কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি পরিবারের কাছে জানিয়েছিলেন, অভিযুক্ত নারীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র তিন দিন আগে, গত রোববার পরিবারের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়।



ছেলের সৌদি আরবে আটক হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে তার মা বিবিসি বাংলাকে জানান, ভাষাগত সমস্যার কারণে প্রথম দিকে তার ছেলে নিজের বক্তব্য অন্যদের কাছে ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেননি। বিদেশে পাঠানোর জন্য যে দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তার কাছেও সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দালাল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সৌদি আরবে পৌঁছে যাওয়ার পর ওই যুবকের বিষয়ে তার আর কোনো দায়িত্ব নেই। ছেলেকে কারাগারে নেওয়ার পর পরিবার স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি বলে জানিয়েছেন তার মা।



স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই যুবকের বয়স আনুমানিক ২২ বছর। তার বাবা একসময় অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু বয়স বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে তিনি আর আগের মতো শ্রমের কাজ করতে পারেন না। পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় দালালের মাধ্যমে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। তবে বিদেশে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায়, ২০২৩ সালে, তাকে আটক করা হয়।



এদিকে, ঢাকায় এক বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি পুরুষ ও নারীকে ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল বলে তারা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের জন্য রেমিট্যান্স আয়ের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও চার লাখের বেশি বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত রয়েছেন। বিদেশে কর্মরত এসব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।



প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে দেশটি নিয়মিতভাবে পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যসহ তালিকা পাঠিয়ে থাকে। এসব তালিকার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার জানতে পারে, কোন নাগরিক কখন এবং কী পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট তালিকাগুলো যাচাই করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই বাংলাদেশির নাম রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তাদের পরিবার থেকেও এ বিষয়ে সরকার আগে কোনো তথ্য পায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া তথ্য হলো, ২০২৩ সালে ওই দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল।



অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদের মতে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে, সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশির আটকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় তিন বছর আগে থেকেই অবগত ছিল। তার অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পরপরই বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং দূতাবাসও তালিকা পাওয়ার পর যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া জরুরি ছিল, বিশেষ করে তারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের পক্ষে নিজেরা আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।



ড. রায়হান রশীদ আরও ব্যাখ্যা করেন, ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে তার নিজ দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে এসব অধিকার সম্পর্কে জানা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই আটক ব্যক্তিকে তার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসেরও দায়িত্ব ছিল বলে তিনি মনে করেন।






সবার আগে পেতে Follow করুন:

" আঁধার আলো নিউজ গুগল নিউজ"

" আঁধার আলো নিউজ টুইটার "

" আঁধার আলো নিউজ ফেসবুক" 

"আঁধার আলো নিউজ পিন্টারেস্ট ;

" আঁধার আলো নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে"

" আঁধার আলো নিউজ লিংকডইন "